দেশাত্মবোধ ও জাতীয়তাবাদের দ্বন্দ্ব।

দেশাত্মবোধ ও জাতীয়তাবোধ এই দুটো শব্দ খুব গুরুত্বপূর্ণ আমাদের বর্তমান ভারতের সমাজকেন্দ্রিক রাজনীতিতে।অথচ কিছুদিন আগেও এই দুটো শব্দের ভিন্নতা সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র জ্ঞান ছিলোনা। এই বিষয়ে খানিক জ্ঞান হওয়ার পর জানতে পারি অনেকেই আছেন যাঁরা দেশাত্মবোধ আর জাতীয়তাবাদকে এক বলে মনে করেন।

শৈশবের গণ্ডি পেরিয়ে আমরা যখন কৈশোরের দিকে পা বাড়াই তখন আমাদের মধ্যে আপনা হতেই সমাজ নিয়ে সচেতনতা বেড়ে যায়,মনের মধ্যে তখনই প্রথম প্রশ্নের আনাগোনা শুরু হয়,প্রতিবাদের স্বর দৃঢ হয় । তখন দেখা যায় যে ছেলেটা খবরের কাগজ শুরু করতো একেবারে শেষের পাতা মানে খেলার পাতা দিয়ে সেও দেশ, বিদেশের নানা ঘটনা,তার প্রভাব এসব নিয়ে কৌতূহলী হয়ে পড়ে। ঠিক এই সময় নানা রাজনৈতিক দলের মতাদর্শ, পন্থা, মেনিফেস্টো এসবের প্রতি অল্পবয়সী ছেলে মেয়েরা আকৃষ্ট হয়।এখন বলে রাখি অল্পবয়সে রাজনীতির প্রতি ঝোঁক জন্মানো প্রায় প্রতিটা যুব প্রাণের কাছে আসল উদ্দেশ্যটা দেশ আর দেশের মানুষ, এবার দেশের প্রতি ওই ভালোবাসা থেকে রাজনীতিতে ঢোকা ছেলে মেয়েদের অনেক সময় নানা রাজনৈতিক দল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে দলগত স্বার্থের অভিমুখী এমন ভাবে করে তোলে যে পরবর্তী সময়ে তাদের দায়বদ্ধতা আর বিবেকবোধে কেবল ব্যক্তিস্বার্থ আর দলগত স্বার্থের গণ্ডিতেই বাঁধা পড়ে। আসলে হয়টা কি, দেশাত্মবোধের নামে ওদের অন্ধজাতীয়তাবাদের মিথ্যে শিক্ষায় দীক্ষিত করা হয়।

একটা বহু প্রচলিত ইংরেজি মতবাদ খানিক তুলে ধরলাম এই দেশাত্মবোধ আর জাতীয়তাবাদের নিরিখে-  The Difference Between Patriotism And Nationalism is That the Patriot is Proud of His Country For What It Does,and The Nationalist is Proud Of His Country No Matter What It Does.

একজন দেশপ্রেমী গর্বিত সে তার দেশের জন্য যা করেছে আর দেশ তার জন্য কি করেছে এই উপলব্ধি নিয়ে, একজন জাতীয়তাবাদীও তার দেশের জন্য গর্বিত কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই মানে সে তার দেশের জন্য কিছু করুক বা নাই করুক, দেশ তার জন্য কিছু করুক কি নাই করুক তাও সে গর্বিত।এই ব্যাপার টার মধ্যে একটা অন্ধ ঔদ্ধত্য আছে। সত্যিকারের দেশপ্রেমিক দেশ বলতে দেশের লোককেও বোঝে আর দেশের লোকের স্বার্থের কথাও ভাবে। জাতীয়তাবাদের এই সংজ্ঞা যদিও সবার ক্ষেত্রে খাটেনা।

প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতে- ” Sense Of Community বা সমাজবোধ নষ্ট হওয়ার পরই শূন্যতা ভরাট করার জন্য জাতীয়তার(Nationalism) প্রয়োজন হয়।ব্যক্তি যেমন এক,নেশন বা জাতিও তেমনই একটি; ব্যক্তি যেমন লাভের জন্য দুঃসাহসী , জাতিও তেমনি শক্তি প্রসারে অভিলাষী”

“আমিত্ব” যেমন এক ব্যক্তিকে তার পারিপার্শ্বিক সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে তেমনি জাতীয়তাবোধ বা বলা ভালো “অন্ধ জাতীয়তাবোধ” একটা দেশ কে বাকি বিশ্বের থেকে বিচ্ছিন্ন করে।একটা গণ্ডির মধ্যে নিজেকে ও দেশকে আবদ্ধ করলে পিছিয়ে পড়া অনিবার্য, প্রবাহমান এই জগৎের ক্রমআধুনিক সভ্যতা থেকে।স্বামী বিবেকানন্দও তাই বিশ্বজনীন ধর্মতে আমাদের দীক্ষিত হতে বলেছেন।

অন্ধ জাতীয়তাবাদ কীভাবে স্বৈরাচারী প্রবৃত্তির উত্থান ঘটায় তার সবথেকে বড়ো প্রমাণ হিটলারের জার্মানি। যার প্রভাব ভোগ করেছিলো গোটা বিশ্ব।

রবীন্দ্রনাথও Nationalism কে Geographical Demon বলে অভিহিত করেছেন তিনি কখনো উগ্র জাতীয়তাবাদ কে প্রশ্রয় দেননি।

অন্ধ জাতীয়তাবোধ আসলে আমাদের অসহিষ্ণু ,আর পরমত ,পর-দেশ বিদ্বেষী করে তোলে। অথচ নিজের দেশের প্রতি কতটা দায়ীত্ববোধ বা কর্তব্যবোধের জন্ম দেয় তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।অন্ধ জাতীয়তাবোধ আসলে এতটাই যান্ত্রিক যে কখনো কখনো দেশহিতৈষণার নেশা স্বয়ং দেশের থেকেও বড়ো মনে হয়।

সম্প্রতি ১১ নভেম্বর ২০১৮, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির শতবর্ষ উপলক্ষে আমেরিকা, ফ্রান্স,জার্মানি,রাশিয়া সহ বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতারা মিলিত হয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধতে নিহিত সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন,সেখানে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট বিশ্বের সমস্ত প্রভাবশালী নেতাদের সামনে উগ্রজাতীয়তাবাদেরর বিপদ সম্পর্কে সচেতনতার বার্তা দেন।একশ বছর আগের আর বর্তমান বিশ্বের তুলনামূলক আলোচনা করে বলেন- ” Nationalism Is Betrayal Of Patriotism”.

উপলব্ধি একদিনে আসেনা, উপলব্ধি আসে অভিজ্ঞতার সিঁড়ি বেয়ে,সদ্য কৈশোর পেরোনো যুবক মন চায় দেশটাকে ভালোবাসতে, দেশের জন্য কিছু করতে তার এই ভালোবাসার, তার এই তাগিদের রাজনীতিকরণ হয়ে গেলে; অজান্তেই তার হৃদয়ের ব্যক্তিস্বার্থের তীব্রতা তার দেশপ্রেমকে জীবন্ত জীবাশ্ম স্বরূপ অতল গভীরে নিহিত করে।উপলব্ধি,বিবেকবোধ, চেতনা এসব কে তখন খুুব সহজে উপেক্ষা করা যায়।

বর্তমান আমাদের দেশে ধর্মকেন্দ্রিক যে জাতীয়তাবাদের দামামা বেজেছে সেটার এখন থেকে সচেতনভাবে প্রতিবাদ না করলে পরে গিয়ে আমাদের দেশের ঐক্য আর গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের উপর সবথেকে বড়ো অশনি সংকেত হবে।

আজ স্বঘোষিত জাতীয়তাবাদীরা বিতর্ক করছে মন্দির-মসজিদ নিয়ে,গো-রক্ষা-গো-মৃত্যু নিয়ে, কে কত বড়ো মূর্তি তৈরি করবে তা নিয়ে,জায়গার নাম বদল নিয়ে,সুপ্রিমকোর্ট এর রায় নিয়ে, কীভাবে পাকিস্তান কে বোম মেরে উড়িয়ে দেওয়া যায় তা নিয়ে, ইত্যাদি আপাত অপ্রাসঙ্গিক জিনিস নিয়ে। দেশের কোটি কোটি টাকা নিয়ে ফেরার ব্যবসায়ী, কৃষক মৃত্যু,চাকরি সমস্যা,নারী সুরক্ষা, ক্রমে বেড়ে চলা জলের সমস্যা,অপুষ্টি, মূল্যবৃদ্ধি,বেড়ে চলা দূষণ এই সব সত্যিকারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গুলো নিয়ে অন্ধ জাতীয়তাবাদীদের মাথা ব্যাথা নেই। কিন্তু যারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক তারা দেশের সমস্যা গুলো নিয়ে ভাবে তারা ক্ষমতায় আসীন লোকেদের প্রশ্ন করারও সাহস রাখে যদিও অনেক ক্ষেত্রে তাদের কপালে জোটে দেশদ্রোহীর তকমা। 

অন্ধ ঔদ্ধত্য মানুষকে অসহিষ্ণু করে তোলে,এবং এই অসহিষ্ণুতা মহামারী ব্যাধির মতো ছড়িয়ে আমাদের দেশের অভ্যন্তরের শান্তি বিঘ্নিত করে।আমাদের উৎস যাই হোক না কেন লক্ষ্য হোক দেশ।দেশ বলতে শুধু ভৌগলিক ভূখণ্ড নয়। একটা দেশ তার নাগরিক দের দিয়েই পূর্ণতা পায়।ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষা বৈচিত্র্য , এসব দিয়েই একটা দেশ পরিচিত হয় গোটা বিশ্বের দরবারে।মূল্যবোধ, চেতনা এসব প্রথমে নিজের দেশের

ভিত্তিতে প্রতিপালন করে আমাদের সমগ্র বিশ্বের স্বার্থে একাত্ম হওয়ার ভাবনা মনে জাগাতে হবে এবং আধ্যাত্মিকতার এই পবিত্র পথে দেশাত্মবোধ আর জাতীয়তাবাদকে এক সূত্রে বাঁধার ব্রতে ব্রতী হতে হবে।কারণ এই বিশাল মহাজগৎের সাপেক্ষে আমরা সবাই সমান।

Debapratim - দেশাত্মবোধ ও জাতীয়তাবাদের দ্বন্দ্ব।

Debapratim Pattanayak

রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ সেন্টেনারি কলেজ, রহড়া
তৃতীয় বর্ষ

State- west Bengal

District-Jhargram Post

Police Station -Gopiballavpur

Block-Gopiballavpur 1

C/O-Ila Pharmacy

Pin-721506

Phone Number-9635314506

 

 

Debapratim

দেবপ্রতিম পট্টনায়ক রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ সেন্টেনারি কলেজ,রহড়া তৃতীয় বর্ষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *