গোপীবল্লভপুর ও তার ইতিহাস

bg 1 - গোপীবল্লভপুর ও তার ইতিহাস
Sidhu Kanu Birsa Setu

গোপীবল্লভপুর সারা দেশে পরিচিতি পেয়েছিল, বিংশ শতাব্দীর সাতের দশকে নকশাল আন্দোলন কে কেন্দ্র করে। তার আগে সপ্তদশ শতক থেকে এই গ্রাম ‘শ্রীপাট গোপীবল্লভপুর’, ‘গুপ্ত বৃন্দাবন’ এইসব নামে পরিচিত ছিলো।কিন্তু তারও আগে সপ্তদশ শতকের গোড়ায় ঠাকুর বাড়ি তৈরি হওয়ার আগে এই গ্রামের কোনো অস্তিত্ব ছিল না।

নয়াবাসান ও তার ইতিহাস


গোপীবল্লভপুর নামের প্রথম উল্লেখ দেখা যায় ১৬৫৫ খ্রীষ্টাব্দে রচিত গোপীজনবল্লভ দাসের রসিক মঙ্গল গ্রন্থে। পূর্বেকার এই স্থানের  নাম ছিল কাশীপুর বা কাশপুর।সুবর্ণরেখা নদীর দক্ষিণ তীরে কাশ জংগল পরিবৃত এই স্থানে ছিল মল্লভূমির অন্তর্গত রোহিণির রাজা অচ্যুত পট্টনায়কের বড়ো ছেলে কাশীনাথের বাগান বাড়ি। সপ্তদশ শতকে রচিত রসিকমংগল গ্রন্থ সূত্রে জানা যায় রাজপুত্র কাশীনাথের পুরী বা গৃহ কাশীপুর নামে পরিচিতি পেয়েছিল। এছাড়াও অনেক সূত্র মিলিয়ে এটা বলা যায় যে গোপীবল্লভপুর নাম হওয়ার আগে এই গ্রাম কাশীপুর নামেই পরিচিত ছিল। রসিকমঙ্গল কাব্যে এই কাশীপুর নিয়ে অপূর্ব বর্ণনা রয়েছে ———

সুবরনরেখার কূল অতি সুশোভিত।

আম কাঁঠালের বন শোভে চোরিভিত।

পুলিন সুন্দর নদী দেখিতে সুন্দর।

যমুনার জল যেন  দেখি পরিমল।

যদিও আজ গোপীবল্লভপুর তথা কাশিপুর খুবিই জনপ্রিয়ও হলেও ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দের আগে কাশিপুর সংলগ্ন নুয়াবাসান (আজ যা নয়াবাসান নামে প্রসিদ্ধ) খুব জনপ্রিয়ও হয়ে উঠেছিল। ১৬৯০  খ্রিস্টাব্দে নয়াবাসান ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ রাজার কাছারি বাড়ি  ছিল। এই কাছারি বাড়িকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্তরের রাজকর্মচারীরা এসে এখানে বসবাস করা শুরু  করেন এবং তাদের প্রয়োজনে অন্যান্য শ্রেণীর মানুষদের ও বসতি গোড়ে উঠে এখানে এবং তখন থেকে এই গ্রামের নামকরন হয় নয়াবাসান (নুয়া অর্থাৎ নয়া বা নূতন করে বসানো গ্রাম)

রসিকানন্দ প্রভুর আগমন ও গোপীবল্লভপুরের জন্ম


রসিকানন্দের পিতা পরলোকগমনের পরে ও পারিবারিক হিংসা থেকে মুক্তি পেতে তিনি তার সমস্ত কিছু ত্যাগ করে পত্নীর হাত ধরে চলে আসেন সুবর্ণরেখার তীরের এই নয়াবাসান গ্রামে। তার কিছুদিন পরে গুরু শ্যামানন্দ ও উপস্তিত হন এই গ্রামে। নদীর তীরের কাশিপুরে ছিল আম – কাঁঠালের বন, কদম্ব বৃক্ষের অপূর্ব বাহার। শ্যমানন্দ কাশিপুর তথা গোপীবল্লভপুরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে মোহিত হয়ে সুবর্ণরেখাকে বৃন্দাবনের যমুনা বলে সম্বোধন করেন এবং এই স্থান এতদিন সবার কাছ থেকে গুপ্ত থাকার জন্য তিনি বলেন গুপ্ত বৃন্দাবন। গুরু   শ্যামানন্দ রশিকানন্দ ও তার পত্নী শ্যামাদাশির অনুরোধে তাদের কুলদেবতার নাম দেন শ্রী গোপীবল্লভ রায় এবং কাশিপুরের নামদেন “গোপীবল্লভপুর”। শ্রী শ্রী রসিকমঙ্গল গ্রন্থে এই নামকরনের উল্লেখ পাওয়াযায়—————

 শুনি শ্যামানন্দ কহে মধুর বচনে ।

গোপীবল্লভ রায় বলিবে সর্বজনে ।

এ গ্রামের নাম শ্রীগোপীবল্লভপুর ।

ইহে সাধু – কৃষ্ণ – সেবা হবে পরচুর । 

ব্রিটিশ শাসনকালে  গোপীবল্লভপুর


১৬১০ সালে গোপীবল্লভপুরের জন্মের পর থেকে এই স্থান ছিল মল্লভূমি রাজ্যের মধ্যে, যা পরে ময়ূরভঞ্জ রাজার  দখলে চলে আসে। সমগ্র জঙ্গলমহল কখনই কোনো এক রাজার অধীনে ছিল না। যখন যে রাজা বাংলা বা উড়িষ্যার মসনদে থাকত আমাদের এই অঞ্চল ও তার অধীনে থাকতো। ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দিল্লির সম্রাটের কাছ থেকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি সনদ লাভ করার পর থেকেই সমগ্র জঙ্গল মহলের থেকে রাজস্ব আদায়ের কথা ভাবতে থাকে। সেইমতো  তারা ১৭৬৭ সালে সেনা অভিযানের দ্বারা ইংরেজরা মেদিনিপুরের ছোটোনাগপুর পার্বত্য প্রদেশ সহ ঝাড়গ্রামের থেকে রাজস্ব আদায় করা শুরু  করে।    এই সময় তারা নয়াবসান- গোপীবল্লভপুরকে মেদিনীপুর জেলার অন্তর্গত করে।

১৮২২ সালের ১ ফেব্রুয়ারী গোপীবল্লভপুর, নায়াগ্রাম সহ সমগ্র উড়িষ্যা ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চলে আসে। ১৮৭২ সালে ব্রিটিশ সরকার গোপীবল্লভপুর সংলগ্ন এলাকাতে শাসন কায়েম করার লক্ষে সুবর্ণরেখা নদীর দক্ষিণের অংশে গোপীবল্লভপুর থানা স্থাপন করে। এই থানার দায়িত্ব ছিল সুবর্ণরেখার উত্তরে অবস্তিত বেলিয়াবেড়া, সাঁকড়াইল এবং দক্ষিণের নায়াগ্রাম ও গোপীবল্লভপুরের বিস্তীর্ণ এলাকার আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করা। এই প্রথম নয়াবসানকে সরিয়ে গোপীবল্লভপুর প্রশাসনিক স্থানের মর্যাদা পেল।

১৮৭২ সালে গোপীবল্লভপুর থানার অধীনে একটি নতুন পলিশ ফাঁড়ির স্থাপন করা হয় নয়াগ্রামে। ১৯২২ সালে ঝারগ্রাম, গোপীবল্লভপুর ও ভীমপুর থানাকে নিয়ে গঠিত হয় স্বতন্ত্র ঝারগ্রাম মহকুমা।  তারপর ১৯৪৫ সালের ১০ জানুয়ারী গোপীবল্লভপুর  থানা বিভাজিত হয়ে জন্ম নেয় পৃথক নয়াগ্রাম, গোপীবল্লভপুর অ সাঁকরাইল থানা। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর যেখানে  ঝাড়গ্রাম থানা ভেঙে গঠিত হয় ঝাড়গ্রাম ও জামবনি থানা এবং ভীমপুর থানা বিভাজিত হয়ে পৃথক বিনপুর, বেলপাহারি ও লালগড় থানা সেখানে গোপীবল্লভপুর থানা ভেঙে হয় গোপীবল্লভপুর ও বেলিয়াবেড়া থানা।

 

Admin

Gopiballavpur is a village, with a police station, in Gopiballavpur I Block in Jhargram subdivision of Jhargram district of West Bengal, India. The town is on the banks of the Subarnarekha River near the Jharkhand and Orissa borders. An Ecopark has been newly constructed in the town by the bank of the river Subarnarekha to attract people.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *